লিভারের সমস্যা শরীরের ভেতরে শুরু হলেও তার বহু সতর্কবার্তা প্রথমে দেখা দেয় ত্বকে। চিকিৎসকরা বলছেন, ত্বকের এসব পরিবর্তন লিভারের গভীরতম জটিলতা সম্পর্কে আগেভাগে ধারণা দেয় এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে সহায়তা করে। হার্ভার্ড-প্রশিক্ষিত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি জানাচ্ছেন, দীর্ঘমেয়াদি লিভার সমস্যায় ত্বকে যেসব চারটি লক্ষণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং যেগুলোকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
প্রথম লক্ষণ: ত্বক ও চোখের হলুদ বর্ণ বা জন্ডিস
লিভার রোগে সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হলো জন্ডিস। এতে ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায়। লিভার ঠিকভাবে বিলিরুবিন নামের রঞ্জকদ্রব্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ফলে তা শরীরে জমতে থাকে এবং ত্বকের রং পরিবর্তন করে। এ হলুদভাব হালকা থেকে তীব্র হতে পারে। গাঢ় ত্বকের মানুষের ক্ষেত্রে জন্ডিস তুলনামূলক কম চোখে পড়ে, তাই যেকোনো স্থায়ী হলুদভাবকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করা জরুরি।
দ্বিতীয় লক্ষণ: স্পাইডার অ্যাঞ্জিওমা ও পামার এরাইথেমা
দীর্ঘদিনের লিভার রোগে ত্বকে রক্তনালীর অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। স্পাইডার অ্যাঞ্জিওমা বলতে ত্বকে জালের মতো লাল ছোট রক্তনালীর বিস্তারকে বোঝায়, যা সাধারণত মুখ, গলা ও বুকে দেখা যায়। একইভাবে পামার এরাইথেমা হলো হাতের তালু লাল ও উষ্ণ হয়ে ওঠা। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও রক্তপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে এ উপসর্গগুলো দেখা দেয়। এগুলো লিভারের সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত, বিশেষত অন্য উপসর্গগুলো থাকলে।
তৃতীয় লক্ষণ: তীব্র চুলকানি বা প্রুরাইটাস
চুলকানি অনেক সময় ত্বকের কোনো দাগ ছাড়াই দেখা দেয়, তবে এটি লিভারের জটিলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ। লিভার স্বাভাবিকভাবে পিত্ত নিঃসরণ করতে না পারলে পিত্তলবণ রক্তে জমে ত্বকে সঞ্চিত হয়। সেগুলো প্রদাহ তৈরি করে এবং তীব্র চুলকানি সৃষ্টি করে। অনেকের ক্ষেত্রে এই চুলকানি এতটাই অসহনীয় হয় যে তা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে। কারও অজানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে চুলকানি থাকলে অবশ্যই লিভারের খোঁজ নিতে হবে।
চতুর্থ লক্ষণ: ত্বকের অতিরিক্ত রঞ্জন ও নখে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
লিভারের সমস্যায় ত্বকে কালচে বা ছোপ ছোপ দাগ তৈরি হতে পারে। হরমোনের তারতম্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহকে এ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ ধরা হয়। নখেও দেখা যেতে পারে বিশেষ কিছু পরিবর্তন। যেমন টেরির নেইলস, যেখানে নখের বেশিরভাগ অংশ সাদা হয়ে যায়, কেবল প্রান্তে সরু গোলাপি রেখা থাকে। কখনো দেখা যায় মিউরক্স লাইন্স নামের সাদা দাগ বা ব্যান্ড। দুটোই লিভারের কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং প্রোটিন বিপাকের সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
ডা. সেঠির পরামর্শ
তিনি বলেন, এসব উপসর্গ অনেক সময় সার্বিক শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং চিকিৎসকদের জন্য মূল্যবান নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। ত্বকের পরিবর্তনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে, তার সঙ্গে যদি ক্লান্তি, পেট ফোলা বা স্থায়ী জন্ডিস দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। লিভার রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসা কার্যকর হয় এবং জটিলতা কমানো যায়।
ত্বকের পরিবর্তন আসলে শরীরের ভেতরের লিভারের অবস্থারই প্রতিবিম্ব। তাই সংকেতগুলো চিনে নেওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া লিভারের সুস্থতা রক্ষার মূল চাবিকাঠি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সোহেল
রানা।
নির্বাহী সম্পাদক: ডাঃ ফজলুর রহমান
(সবুজ)